আজ শনিবার| ১১ই জুলাই, ২০২০ ইং| ২৭শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
আজ শনিবার | ১১ই জুলাই, ২০২০ ইং

বজ্রপাত এবং প্রসঙ্গ কথা

শনিবার, ২৭ জুন ২০২০ | ১০:৩৭ অপরাহ্ণ | 36 বার

বজ্রপাত এবং প্রসঙ্গ কথা

মো. বাকী বিল্লাহ খান পলাশ: মহামারী করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুতে কিছুটা ¤øান হলেও যে খবরটি পত্র-পত্রিকা এবং সংবাদে চোখে পড়ে তা হলো বজ্রপাতে মৃত্যু। শৈশব থেকেই আমরা দেখে এসেছি বর্ষায় বৃষ্টি। কালে ভাদ্রে বন্যার সর্বগ্রাসী ভয়াল রূপ। কিন্ত গত এক দশক ধরে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু। যা সাধারণত এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এটিএন বাংলার সংবাদ সুবাদে জানা যায় প্রতিবছর দেশে বজ্রপাতে মৃত্যু বরণ করছে গড়ে দুশ শত পঞ্চাশ জনেরও বেশী মানুষ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের এক হিসাব মতে গত দশ বছরে (২০১০ থেকে ২০১৯ মাস পর্যন্ত ) দেশে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছে দুই হাজার ৮১ জন। শুধুমাত্র ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দেই মৃত্যু বরণ করেছে সর্বাধিক ৩৫৯ জন। আর ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে চার দিনে সর্বাধিক ৮১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ফলে সে বছরই সরকার বজ্রপাতকে দেশের আরেকটি দুর্যোগ হিসাবে ঘোষণা করে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপাটমেন্ট অব জিওগ্রাফি তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, বিশ্বে বজ্রপাতে সর্বাধিক মৃত্যুর দেশ বাংলাদেশ। আর বিশ্বের মোট বজ্রপাতের এক-চতুর্থাংশ ঘটে এদেশে যা ন্যাশনাল লাইটনিং সেফটি ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এইচ. এম. আসাদুল হক বলেন, দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগে যত মানুষ মারা যায় তার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বজ্রপাতে মৃত্যু।

বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে বজ্রপাতের উপযোগিতা :
উপর্যুক্ত তথ্যাদি থেকে এটাই মনে হতে পারে যে, বজ্রপাত মানেই মৃত্যু। কিন্তু আসলেইকি তাই। অথচ মহান অভিবাবক আল্লাহু আকবার পবিত্র কোরআনুল করীমে এরশাদ করেন, আমি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং তাদের মধ্যে কোন কিছুই অনর্থক সৃষ্টি করিনি (সূরা আদ দোখান, আয়াত নং. : ৩৮)। বস্তুুত আমাদের এই প্রিয় পৃথিবীকে ঘিরে রয়েছে বাতাসের এক অদৃশ্য আবরণ যাকে আমরা বায়ুমন্ডল বলি। আর ভূপৃষ্ট থেকে ১৪-১৫ কিলোমিটার উচুঁ পর্যন্ত বায়ুস্তরের নাম ট্রোপোস্ফিয়ার। এই ট্রোপোস্ফিয়ারের মধ্যেই ঝড়ঝঞ্জা- তুষার-বৃষ্টি-বজ্রের অবস্থান। বায়ুমন্ডলের এই স্তরেই রয়েছে অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড প্রভৃতি গ্যাস। এর পরিমাণ নাইট্রোজেন ৭৭.১৬ শতাংশ, অক্সিজেন ২০.৬০ শতাংশ, জলীয় বাষ্প ১.৪০ শতাংশ, কার্বন-ডাই-অক্সাইড ০.০৪ শতাংশ এবং অন্যান্য গ্যাস ০.০৮ শতাংশ। মূলত মেঘে মেঘে ঘর্ষণের ফলে ঘটে ইলেকট্রনের আদান প্রদান। এই আদান প্রদান এক মেঘ থেকে অন্য মেঘে সশব্দে ছড়িয়ে পড়ে বা মাটিতে নেমে আসে। বিজ্ঞানীদের ভাষায় এটাই বজ্রপাত যা আমাদের এই সুবিশাল বায়ুমন্ডলে গড়ে প্রতি ঘন্টায় প্রায় তিন হাজারবার সংঘটিত হয়। বজ্রপাতের সময় নাইট্রোজেন অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তৈরি করে নাইট্রোজেন অক্সাইড। এই অক্সাইড পানির সংস্পর্শে এসে পরিণত হয় অতি লঘু নাইট্রিক অ্যাসিডে। এই নাইট্রিক অ্যাসিড বৃষ্টির মাধ্যমে মাটিতে নেমে আসে এবং তা মাটির অভ্যন্তরে সহজেই প্রবেশ করে। মাটিতে থাকা বিভিন্ন খনিজ পদার্থ সহজেই এই নাইট্রিক অ্যাসিডের সাথে দ্রবীভূত হয়ে যায়। অ্যাসিড এবং ধাতব অক্সাইডের বিক্রিয়ায় মাটিতে উৎপন্ন হয় নাইট্রেট লবণ যা উদ্ভিদের অন্যতম পুষ্টি উপাদান। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো বাতাসে এই নাইট্রোজেনের পরিমাণ ৭৭.১৬ শতাংশ হলেও মাটিতে এর পরিমান খুবই কম যা মাত্র ০.১ শতাংশ। অথচ মাটির প্রোটিন বা অ্যামিনো অ্যাসিডের অপরিহার্য উপাদান এই নাইট্রোজেন। যা বায়ু মন্ডলে বিপুল পরিমানে থাকা সত্তে¡ও এই নাইট্রোজেন প্রাণী বা উদ্ভিদ গ্রহণ করতে পারে না।। ফলে উদ্ভিদ বা প্রাণীর অস্তিত্ব রক্ষার অপরিহার্য উপাদান এই নাইট্রোজেনকে মাটির পরোক্ষ প্রোটিনের উৎস হবার সুযোগটি করে দেয় এই বজ্রাপাত। কাজেই দেখা যায় যে, উদ্ভিদ তথা প্রাণীর জীবন রক্ষায় বজ্রপাতের রয়েছে একটি অসামান্য অবদান। পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলের বাতাসে থাকে অ্যামোনিয়া, সালফার-ডাই-অক্সাইড, হাইড্রোজেন সালফাইড প্রভৃতি গ্যাস। যা বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ। বায়ুমন্ডলে বজ্রপাত হবার ফলে এই গ্যাসগুলো অতিলঘু অ্যাসিডে পরিবর্তিত হয়ে মাটিতে নেমে আসে ফলে শুধু উদ্ভিদ বা প্রাণীর জীবন রক্ষার্থেই নয় দূষণ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ তৈরিতেও রয়েছে বজ্রপাতের অনেক বড় ভূমিকা ।

কোরআন-হাদীসে বজ্রপাত ও করণীয় :
বাংলা শব্দ বজ্রর আরবি প্রতিশব্দ রা’দ। যে নামে পবিত্র কোরআনুল করীমের ১৩ নং সুরাটির নামকরণ করা হয়েছে। বজ্র সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন, ‘বজ্র তারঁই তাসবিহ ও হামদ জ্ঞাপন করে এবং তাঁর ভয়ে ফেরেশতাগণও (তাসবিহরত রয়েছে)। তিনিই গর্জমান বিজলি পাঠান, তারপর যার ওপর ইচ্ছা একে বিপদরূপে পতিত করেন। আর তাদের (অর্থাৎ কাফিরদের) অবস্থা এই যে তারা আল্লাহ সম্পর্কেই তর্কবিতর্ক করছে, অথচ তাঁর শক্তি অতি প্রচন্ড’(সূরা রা’দ, আয়াত নং. : ১৩)।
বজ্রপাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রিয় নবী (সা.) আমাদের কিছু দোয়া শিখিয়েছেন। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) তাঁর বাবা থেকে বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) যখন বজ্রের শব্দ শুনতেন তখন তিনি বলতেন, ‘আলাহুম্মা লা তাকতুলনা বিগজাবিকা ওয়ালা তুহলিকনা বিআজাবিকা ওয়া আ-ফিনা কবলা জালিকা’ (তিরমিজি, হাদিস নং. : ৩৪৫০)।
অন্য রেওয়ায়েতে আছে, হজরত ইবনে আবি জাকারিয়া থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি বজ্রের আওয়াজ শুনে এ দোয়া পড়বে ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’ সে বজ্রে আঘাতপ্রাপ্ত হবে না (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস নং. : ২৯২১৩)।

বজ্রপাতে মৃত্যু কি শহীদি নাকি অভিশাপের :
বজ্রপাতে মৃত্যুকে কেউ কেউ শহীদি মৃত্যু বলে থাকেন। অথচ সহিহ বুখারী হাদীস নং ২৮২৯ এ বর্ণিত ৫ বা ৭ প্রকারের অথবা সুনানে আবু দাউদে যে ১০ প্রকারের শহীদি মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে সেখানে বজ্রপাতে মৃত্যুর কোন কথা উল্লেখ নেই। এ সম্পর্কে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, মুমিনের জন্য আকর্ষিক মৃত্যু হচ্ছে একটি ‘রহা’ বা প্রশাšিতর । কেননা এর দ্বারা মুমিন আল্লাহর সানিধ্যে চলে যান, জান্নাতের পথে অগ্রসর হন বা দুনিয়ার কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়ে যান। সুতরাং বজ্রপাতে মৃত্যুকে শহীদি মৃত্যু বলার কোন অবকাশ নেই। অপরদিকে কেউ কেউ এই মৃত্যুকে ঠাডা পড়া মৃত্যু বা অভিশাপের মৃত্যুও বলে থাকেন যা একটি জঘন্যতম অপরাধ কেননা পবিত্র কোরআনুল করীম বা হাদীস গ্রন্থে কোথাও বজ্রপাতে মৃত্যুকে অপমৃত্যু বা আল্লাহর গজবের মৃত্যু বলা হয়নি সুতরাং যারা বজ্রপাতে মৃত্যুকে শহীদি মৃত্যু বা অভিশাপের মৃত্যু বলে আখ্যায়িত করছেন তার কোনটাই সঠিক নয় এবং এটা নিছক একটা কুসংস্কার মাত্র।

বজ্রপাতে মৃতের লাশ চুরি :
কখনো কখনো শোনা যায় বজ্রপাতে নিহত ব্যক্তির লাশ চুরি হয়ে যায়। বস্তুুত এখানে যেমন দুটি গুজব কাজ করছে তেমনি লাশ চুরি একটি ভয়াবহ অন্যায়ও । প্রথমত মনে করা হয় যে বজ্রপাতে নিহত ব্যক্তির শরীর প্রাকৃতিক চুম্বক বা মূল্যবান ধাতুতে পরিণত হয় অপরদিকে এ জাতীয় মৃত ব্যক্তিদের কিছু হাড় দিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সাধনা করলে অলৌকিক ক্ষমতা অর্জন করা যায় বা জাদু বিদ্যা করা যায়। যার কোনটারই কোনো সত্যতা নেই। এবং যার পুরোটাই অপ্রমানিত। আরো প্রচারিত আছে যে, যেখানে বজ্রপাত হয় তার আশেপাশে মূল্যবান খনিজ টুকরা পাওয়া যায়। এটাও শতভাগ ভিত্তিহীন।
দ্বিতীয়ত মৃত মানুষ জীবিত ব্যক্তির ন্যায় সমান সম্মানের কেননা ইসলামে একজন জীবিত ব্যক্তিকে যেমন অসম্মান করা নিষেধ তেমনি মৃত ব্যক্তির সঙ্গেও কোন প্রকারের মর্যাদাহানীকর আচরণ করা হারাম। হাদিস শরিফে তাই এরশাদ হয়েছে ‘মৃত লাশের হাড্ডি ভাঙ্গা জীবিত মানুষের শরীরের হাড্ডি ভাঙ্গার মতোই জঘন্য কাজ’ (আবু দাউদ শরিফ)। উপরন্তু মৃত ব্যক্তির লাশকে এতটাই শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়েছে যে, দীর্ঘদিনের কবরস্থ লাশ যা হয়তো মাটি হয়ে গেছে বা যার হাড়ও খুঁজে পাওয়া যাবে না সেই কবরকেও অসম্মান করা নিষেধ। হাদিসে এসেছে ‘তোমরা কবরের ওপর বোসো না’ (মুসলিম)। সুতরাং মৃত বা বজ্রপাতে মৃত যে কোন ব্যক্তির লাশই হোক তা চুরি থেকে বিরত থাকা একান্ত অপরিহার্য।

কিছু ভুল ধারণা :
১. অনেক মুরুব্বি বা অনেকেই বলে থাকেন যে, ব্রিটিশ আমলে সীমানা প্রাচীর স্থাপন করা হয়েছিল যা বাজকে (বজ্র) নিজের ভিতর আকর্ষণ করত ফলে তখন বাজ কম পড়ত। বস্তুত নিদিষ্ট কোন এলাকার কোন একটি উচুঁ জায়গায় সাধারণত বাজ পড়ে যেমন : গ্রামের উচু তালগাছ, বটগাছ, খোলা মাঠে একা দাড়িয়ে থাকা মানুষ, গরু, উচু বিলিং, রাস্তার ল্যাম্পপোষ্ট, মোবাইল টাওয়ার ইত্যাদি। সুতরাং ব্রিটিশদের স্থাপিত সীমানা পিলার চুরি হওয়াতে এখন বজ্রপাত বেশী হয় এ ধারণা ঠিক নয়।
২. অনেকে বলে থাকেন, দেহে কোন ধাতব বস্তুু থাকলে তা বজ্রকে আকৃষ্ট করে। এ ধারণাও সঠিক নয় কেননা ব্যাটারি চালিত হাত ঘড়ি বা কোন স্বর্ণালংকার কোনভাবেই বজ্রপাতকে আকৃষ্ট করে না।
৩. অনেকেই মনে করেন যে বজ্রের বিদ্যুতে পুড়ে ব্যক্তি মারা যায়। বস্তুত দেখা গেছে যে বজ্রপাতে সরাসরি আক্রান্ত ব্যক্তি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়না ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বজ্রপাতে মৃত ব্যক্তির শরীরে মারাতœক কোন পোড়ার ক্ষত পাওয়া যায় না। বস্তুত বজ্রপাতে মৃত্যুর পেছনে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য যে কারণটি রয়েছে তাহলো বজ্রপাতে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের উপরিভাগ দিয়ে প্রবাহিত হওয়া উচ্চ মাত্রার বৈদ্যতিক ভোল্টের কারণে ¯œায়ুতন্ত্রের কার্যক্রম মারাতœকভাবে বাধাগ্রন্থ হওয়া এবং ফুসফুসের কার্যকারিতা হ্রাস পেযে শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে ব্যক্তির মারা যাওয়া।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্নিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের প্রবল পরাক্রমশালী প্রভু বলেছেন, যদি আমার বান্দারা আমার বিধান মেনে চলত, তবে আমি তাদের রাতের বেলায় বৃষ্টি দিতাম, সকালবেলায় সূর্য দিতাম এবং কখনো তাদের বজ্রপাতের আওয়াজ শোনাতাম না (মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং. : ৮৭০৮)। সুতরাং আল্লাহ্তায়ালা তার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আমাদের তাঁর এবং তাঁর রাসুল (সা.) এর যেভাবে আনুগত্য করা উচিত আল্লাহ্তায়ালা আমাদের সেভাবে ইবাদত বন্দেগি করার তৌফিক দান করুন এবং বজ্রপাতসহ সকল বিপদ থেকে আমাদের হেফাযত করুন, আমিন।

শেয়ার করুন-Share on Facebook
Facebook
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Print this page
Print

সর্বশেষ  
জনপ্রিয়  
ফেইসবুক পাতা

error: Content is protected !!