ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধ করা জরুরি : শহীদুল হক

সারা পৃথিবীই এখন ডিজিটালাইজড হয়েছে। অফিস-আদালত, ব্যাংক-বীমা, শিল্প-কলকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, যানবাহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমন কোনো সেক্টর নেই, যেখানে কম্পিউটার ব্যবহার হয় না বা সফটওয়্যার ও ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার হয় না। কাজের গতিশীলতা, গুণমানের উৎকর্ষ, আধুনিকীকরণ, স্বচ্ছতা ও সহজীকরণের জন্য তথ্যপ্রযুক্তির ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার না করার কথা চিন্তাই করা যায় না। মানুষের কল্যাণের জন্য বিজ্ঞান নিত্যনতুন আবিষ্কার করছে। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অপরাধী চক্র বিজ্ঞানের সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে নানারকম অপরাধও সংঘটন করছে।

 

সাইবার ক্রাইম আজ বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ ও ভীতির ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিজিটাল ডিভাইস হ্যাকিং করে হ্যাকাররা নানা রকম অপরাধ করছে। হ্যাকাররা ম্যালওয়্যারের মাধ্যমে কম্পিউটার সিস্টেমের ধস নামিয়ে দিতে পারে। সব ডিভাইস বিকল করে দিতে পারে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ক্রেডিট কার্ডের টাকা চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণার মাধ্যমে তাদের চরিত্র হনন করা হচ্ছে। ভাবমূর্তি বিনষ্ট করে তাদের প্রভূত ক্ষতিসাধন করা হচ্ছে। গুজব ছড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো হচ্ছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির পরিস্থিতি তৈরি করছে। মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানছে। অশ্লীল ছবি ও প্রচারণা করে যুবকদের বিপথে নিয়ে যাচ্ছে।

 

হ্যাকাররা ম্যালওয়্যারের মাধ্যমে কম্পিউটার সিস্টেমের ধস নামিয়ে দিতে পারে। সব ডিভাইস বিকল করে দিতে পারে। ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ও ক্রেডিট কার্ডের টাকা চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণার মাধ্যমে তাদের চরিত্র হনন করা হচ্ছে। ভাবমূর্তি বিনষ্ট করে তাদের প্রভূত ক্ষতি সাধন করা হচ্ছে। গুজব ছড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো হচ্ছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির পরিস্থিতি তৈরি করছে। মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানছে। অশ্লীল ছবি ও প্রচারণা করে যুবকদের বিপথে নিয়ে যাচ্ছে।

 

সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধ এবং সাইবার ক্রাইমের বিচারের জন্য বিভিন্ন দেশে আইন প্রণীত হয়েছে। আমাদের দেশেও ২০১৮ সালে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট পাস হয়েছে। উদ্দেশ্য, ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা দেওয়া। এই আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে প্রথম থেকেই সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের কেউ কেউ আপত্তি তুলেছিলেন। তাদের বক্তব্য এই আইনের মাধ্যমে নাগরিকদের বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা হচ্ছে। বিশেষ করে, সাংবাদিকরা মুক্তভাবে কোনো কিছু লিখতে পারছেন না।

 

সরকার আশ্বাস দিয়েছিল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে কোনো সমস্যা সৃষ্টি করবে না। কিন্তু সাংবাদিকরা অভিযোগ করছেন যে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন পাস হওয়ার পর অন্তত ৪৬ জন সাংবাদিককে এই আইনে গ্রেফতার করা হয়েছে। অনেক নিরপরাধ ব্যক্তিকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। লেখক মুশতাক ও কার্টুনিস্ট কিশোরকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করে ১০ মাস জেলে রাখা হয়েছিল। তাদের শারীরিক নির্যাতনও করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। ছয়বার জামিন চেয়েও জামিন মেলেনি। শেষ পর্যন্ত লেখক মুশতাক জেলে মৃত্যুবরণ করেন।

 

এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট বাতিলের দাবি উঠেছে। সাংবাদিক, আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের ব্যক্তিরা এই আইনকে কালো আইন বলে আখ্যায়িত করছেন। তারা এটাকে নাগরিকদের মতপ্রকাশের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘনের হাতিয়ার বলছেন। তারা এই আইন বাতিল চান। কেউ কেউ সংশোধন চান।

 

ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনটি আসলে কালো আইন নয়। এই আইন সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। সংবিধানের ৩৯ নম্বর আর্টিকেলে কতিপয় শর্তসাপেক্ষে নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। ওই আর্টিকেলে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধসাপেক্ষে ক. প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাবপ্রকাশের অধিকারের এবং খ. সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হলো।

 

সংবিধানের এই অনুচ্ছেদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫ ধারার সংযোজন করা হয়েছে। ২৫ ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে ক. ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে, এমন কোন তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ করেন, যাহা আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শক অথবা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোন ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্থ বা হেয়প্রতিপন্ন করিবার অভিপ্রায়ে কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন, বা খ. রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ন করিবার, বা বিভ্রান্তি ছড়াইবার, বা তদুদ্দেশে অপপ্রচার বা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোনো তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ, বা প্রচার করেন বা করিতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।’

 

যুদ্ধাপরাধী মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিচারের রায় ঘোষণার পর চাঁদে সাঈদীর ছবিসংবলিত মিথ্যা চিত্র প্রচার করে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটানো হয়েছিল, ২০১৩ সালে শাপলা চত্বর থেকে হেফাজত ইসলামের সদস্যদের তাড়িয়ে দেওয়ার সময় একজন লোকেরও মৃত্যু ঘটেনি। অথচ হাইতিতে ভূমিকম্পে নিহত ব্যক্তিদের ছবি সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করে বলা হয়েছিল ওইগুলো শাপলা চত্বরে নিহতদের ছবি। সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া ছবি ও তথ্য প্রচার করে কক্সবাজারের রামু ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে তাণ্ডব ঘটিয়ে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটানো হয়েছিল। অনেক বাড়িঘর ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর ও পোড়ানো হয়েছিল। এসব অপরাধের জন্যই এই আইনের ২৫ ধারা প্রয়োগের প্রয়োজন।


error: Content is protected !!