ঢাকা, বুধবার, ১৬ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ২রা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
ঢাকা, বুধবার, ১৬ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ২রা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

আল্লামা দুবাগী ছাহেব (রহঃ) সম্পর্কে কিছু অভিব্যক্তি

মুজাহিদে মিল্লাত আল্লামা মুজাহিদ উদ্দীন চৌধুরী দুবাগী রাহিমাহুল্লাহি আলাইহি ছিলেন একাধারে পবিত্র কুরআনুল কারীমের একজন উ”চ¯’রের ক্বারী, ফিক্হ শাস্ত্রের একজন বিখ্যাত পন্ডিত বা মুফতী, ইলমে শরীয়তের একজন সুযোগ্য আলেম তথা মুহাদ্দিস, মুফাস্সির ও বহু গ্রন্ত্রের রচয়িতা উস্তাযুল ক্বুররা ওয়াল ফুকাহা ওয়াল মহাদ্দিসীন ওয়াল মুফাস্সিরীন এবং তৎসহ যামানার শ্রেষ্ঠ ওলী, অলীকুল শিরমনি শামসুল উলামা আল্লামা ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এর হাতে গড়া ও ইজাযত প্রাপ্ত একজন সুযোগ্য খলীফা তথা কামেল ওলী।

 

 

এ মহামনিষীর সাথে জীবনে একবার মাত্রই আমার দেখা হয়। ১৯৯৭ইং সনের শেষ দিকে সম্ভবত: সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাসে তিনি আমেরিকা সফরে আসেন। এই প্রথম ও শেষবারের মত তাঁর সাক্ষাৎ ও সান্নিধ্য লাভের সুযোগ এ অধমের হয়। তবে আগে থেকেই তাঁর সম্বন্ধে আমার কিছুটা অবগতি ছিল। তা এভাবে যে, তিনি ছিলেন আমার উস্তাযুল আসাতিযা অর্থাৎ আমার কয়েকজন সম্মানিত উস্তাদের উস্তাদ ছিলেন তিনি। দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ১৯৭৩ইং সনের গোড়ার দিকে আমি যখন সৎপর দার“ল হাদীস কামিল মাদ্রাসায় আলিম ১ম বর্ষে ভর্তি হই তার আগেই দুবাগী হুজুর সৎপুর মাদ্রাসা থেকে চলে গেছেন। সুতরাং তখন শুধু আমার সহপাঠীদের নিকট থেকে তাঁর নাম শুনেছি কিš‘ তাঁর সাক্ষাৎ বা সাহচর্য্য পাই নাই। তবে তাঁর সুযোগ্য ছাত্রদের মধ্যে যাঁরা সৎপুর মাদ্রাসা থেকে ফারিগ হয়ে সেখানেই শিক্ষকতায় নিয়োজিত হন, তাদের কয়েকজনের নিকটই আমার পড়ার সুযোগ হয়। তন্মধ্যে অন্যতম ছিলেন শায়খুল হাদীস হযরত আল্লামা রইস উদ্দীন হামযাপুরী মুহাদ্দিস ছাহেব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি।

 

 

ছাত্র জীবন শেষ হওয়ার পর আমি যখন কর্মজীবনে পদার্পন করি, তখন হামযাপুরী হুজুর মরহুম আল্লামা রইস উদ্দীন সাহেবের ওয়াজের সুখ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে বয়ানের মধ্যে তিনি তাঁর দুবাগী হুজুরের রেফারেন্স দিয়ে বিভিন্ন ফিক্হ মাসআলার সমাধান পেশ করতেন। আমাদের দেশের তৎকালীন প্রচলিত রীতি বিরোধী মাসআলা গুলি আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলতেন আমার দুবাগী হুজুর লন্ডন থেকে চিঠি দিয়ে আমাকে বিষয়টি এভাবে জানিয়েছেন। অর্থাৎ শুধু দুবাগী হুজুরের রেফারেন্সই যথেষ্ঠ মনে করে তিনি মাসআলাগুলি আলোচনা করতেন। এতে দুবাগী হুজুরের প্রতি তাঁর আ¯’া যে কত বেশি ছিল তা পরিচয় পাওয়া যায়।

 

 

আমেরিকার মিশিগান স্টেটের ডেট্রয়েট সিটির বায়তুল ইসলাম মসজিদের দাওয়াতে তিনি এখানে এসেছিলেন। তখন আমি অধম উক্ত মসজিদের ইমাম ও খতিব হিসেবে কর্মরত ছিলাম। প্রোগ্রামের সম্ভবত: পরে বাইতুল ইসলাম জামে মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জনাব সৈয়দ আনোয়ার মিয়া সাহেবের বাসায় একান্ত বৈঠকে আলাপকালে আমি নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে তাঁকে বলেছিলাম; ‘‘আমি আপনার ছাত্র হযরত মাওলানা রইস উদ্দিন হামযাপুরী মুহাদ্দিস সাহেবের ছাত্র, তাই আপনি আমার দাদা উস্তাদ।’’ হয়তোবা আমার কথাটি উনার ভালো লেগেছিল বলেই তিনি পরে তাঁর স্বজনদের কাছে আমার প্রশংসা করেছেন বলে তাঁর মেঝ ছাহেবজাদা মুহতরম মাওলানা অলিউর রহমান চৌধুরী সাহেবের কাছ থেকে জানতে পেরেছি।

 

 

সে যা হোক, আল্লামা দুবাগী ছাহেব (রহঃ) যে শরীয়ত ও মা’রিফাতের উ”চাসনে আসীন একজন বিজ্ঞ আলিমেদ্বীন ও কামিল অলী ছিলেন, তা সর্বজন স্বীকৃত। মহান আল্লাহ তাঁর অলীদের সম্পর্কে বলেছেন: ‘‘তাদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ পার্থিব জীবনে ও পরকালীন জীবনে’’ (সুরাঃ ইউনুসঃ ৬৪)। অত্র আয়াতে “পরকালীন জীবনের সুসংবাদ” দ্বারা জান্নাতের সুসংবাদ বোঝানো হয়েছে । আর পার্থিব জীবনের সুসংবাদ এর একাধিক অর্থের মধ্যে একটি হ”েছ: দুনিয়ার মানুষের অন্তরে তাদের মহব্বত প্রোথিত হবে মানুষ তাঁদের প্রশংসা ও গুণকীর্তন করবে।

 

 

এ মর্মে সহীহ মুসলিমে হযরত আবু যর (রা:) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রয়েছে: আমরা বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ: এক ব্যক্তি আল্লাহর সš‘ষ্টির উদ্দেশ্যে নেক আমল করে অথচ লোকেরা তার প্রশংসা করে। (অর্থাৎ তা হলে তার নেক আমল কি রিযার পর্যায়ে পড়বে?) উত্তরে নবীজী (সা:) বললেন: ‘‘এটা হলো মুমিনের অগ্রীম সুসংবাদ’’।

 

 

এতদ্ব্যতীত বোখারী ও মুসলিমে হযরত আনাস (রা:) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে; এক ব্যক্তির জানাযা দিয়ে যাওয়া হলে লোকেরা তার প্রশংসা করল্ তখন নবীজী (সা:) বললেন, ‘‘ওয়াজিব হয়ে গেছে’’ । কিছুক্ষণ পর আরেকটি জানাযা নিয়ে যাওয়া হলে লোকেরা তার সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করল। (এবারও) নবীজি (সা:) বললেন ‘‘ওয়াজিব হয়ে গেছে’’। এতদ্শ্রবণে হযরত উমর (রা:) বললেন, কি ওয়াজিব হয়ে গেছে? উত্তরে নবী করীম (সা:) বললেন: যে ব্যক্তি সম্পর্কে তোমরা ভাল মন্তব্য করেছ, তাই তার জন্য বেহেশত ওয়াজিব হয়ে গেছে। আর এ ব্যক্তি সম্পর্কে তোমরা খারাপ মন্তব্য করেছ তাই তার জন্য দোযখ ওয়াজিব হয়ে গেছে। তোমরা হলে পৃথিবীতে আল্লাহর স্বাক্ষী।

 

 

এবারে উপরোল্লিখিত সূরার ৬৪নং আয়াতে ও বোখারী মুসলিম থেকে উদ্ধৃত হাদীস শরীফ দু’খানাকে সামনে রেখে আমি শুধু এটাই বলবো যে, আল্লামা দুবাগী ছাহেবের ইন্তেকালের পর দেশ-বিদেশের অনেক বাঙ্গালী-অবাঙ্গালী বরেণ্য আলিম উলামা ও অলী-আউলিয়া বিভিন্ন আলোচনা ও শোকবার্তায় তাঁর প্রশংসা ও উত্তম গুণাবণী বর্ণনা করে আসছেন, এটাই মহান আল্লাহর দরবারে তাঁর মকবুলিয়ত ও বেহেশতী বান্দা হওয়ার প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ঠ বলে আমি মনে করি। আল্লাহ পাকের এ নেক বান্দার সাথে যেহেতু আমি অধমের উঠা বসার সুযোগ হয় নাই, তাছাড়া কোন মহান ব্যাক্তির শান বা মর্যাদা সম্পর্কে কিছু বলা এমন ব্যক্তিদের জন্যই শোভনীয় মনে করি। যাঁরা তাঁর সমপর্যায়ের অথবা তাঁকে কাছে থেকে দেখেছেন এবং তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ করেছেন। সুতরাং আমি নিজে থেকে আর কিছু বলার দু:সাহস না দেখিয়ে তাঁর ইন্তেকালের পর যেসব বিজ্ঞজনেরা তাঁর উ”চ মর্যাদা সম্পর্কে কথা বলেছেন, তাঁদের একজনের উদ্ধৃতি দিয়ে আমার কথা শেষ করছি।

 

 

আল্লামা দুবাগী ছাহেবের ইন্তেকালের পর আঞ্জুমানে আল্-ইসলাহ ইউ.এস.এ কর্তৃক আয়োজিত ভার্চুয়াল ঈসালে সওয়াব মাহফিলে ‘আঞ্জুমানে আল-ইসল্হা- বাংলাদেশ’ এর মুহতারাম সভাপতি বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ হযরত মাওলানা হুসাম উদ্দিন চৌধুরী ছাহেব জাদায়ে ফুলতলী মুদ্দাযিল্লুহুল আলী এর সংক্ষিপ্ত আলোচনাটি আমার কাছে অত্যন্ত চমৎকার মনে হওয়ায় অত্র আলোচনার বিশেষ কিছু অংশ ভিডিও রেকর্ড থেকে কপি করে লিখিত আকারে প্রিয় পাঠক-পাঠিকার সামনে তুলে ধরছি।

 

মুহতারাম ছাহেবজাদা তাঁর মূল্যবান বক্তব্যে বলেন:-

“আল্লামা দুবাগী ছাহেব (রহঃ) ছিলেন উস্তাযুল আসাতিযা, ফকীহ, মুহাদ্দীস, মুআদ্দিব, বহু গ্রন্ত্র প্রনেতা, আমাদের বিশিষ্ট পরামর্শদাতা মুরব্বী, অভিভাবক, ইলমেদ্বীনের তথা ইসলামের বহুবিধ খেদমতের পুরোধা এবং হযরত ছাহেব কিবলাহ (রহঃ) এর অত্যন্ত øেহভাজন ও ইজাযত প্রাপ্ত খলীফা। তাঁর ইন্তেকালে আমরা একজন সাহসী আলেমেদ্বীন, মুনাযীরে আযম ও ভাষাবিধ পন্ডিতকে হারিয়েছি। তিনি ফতোয়ার কিতাব রচনা করেছেন, বহু এখতেলাফী মাসআলার সমাধানকল্পে বই পুস্তক লিখেছেন। যখন বই পুস্তক বের হতো না তখন ও তিনি ছোট ছোট পুস্তিকা বা কাগজের পৃষ্ঠার মধ্যে ফটোষ্ট্যাট করে বিভিন্ন মাসআলার সমাধান মানুষের ঘরে ঘরে পৌছিয়ে দিতেন।

 

 

আজ বৃটেনে ইসলামী কার্য্যক্রম তুলনামোলক ভাবে অনেকাংশে বেশী বলা যায়। কিš‘ যখন কেউ ছিলেন না। কোন মসজিদ ছিল না। কোন মাদ্রাসাও ছিল না। সে সময় প্রতিষ্ঠানের চিন্তা তথা মানুষকে শরয়ী বিধান জানানোর জন্য যারা তাঁদের জীবনকে কোরবানী করেছেন, তাদের অন্যতম পুরোধা ছিলেন আল্লামা দুবাগী ছাহেব। আজকে বহু মাদ্রাসা হয়েছে, আমাদের বহু প্রতিষ্ঠান হয়েছে, সকলই তাঁর কর্ম কান্ডের ফসল। বহু মানুষকে তিনি দ্বীনের পথে এনেছেন, বেনামাযীকে নামাযের প্রতি উৎসাহিত করেছেন, হারাম ব্যবসা থেকে হালালের প্রতি উৎসাহিত করেছেন। তিনি একাধারে একজন মুহাক্কিক ও সিলসিলার একজন সাহসী আলেমে দ্বীন ছিলেন। তাঁর মধ্যে সাখাওয়াত ছিল, শরাফত ছিল, তিনি মানুষের জন্য জীবনে বহু ত্যাগ স্বীকার করেছেন। হযরত ছাহেব কিবলা (রহঃ) এর একজন সুযোগ্য প্রতিনিধি হিসাবে তিনি বৃটেনকে আলোকিত করেছেন। তাঁর জন্য সওয়াব রেসানী করা ও তাঁর এহসানের প্রতিদান দান করা সকলের কর্তব্য।”

 

 

আঞ্জুমানে আল-ইসলাহ্র মুহতরম সভাপতি সাহেবের মহামূল্যবান বয়ান থেকে উপরের কথাগুলো পেশ করলাম। সে যাই হোক, এ নশ্বর পৃথিবীতে সকলেই অ¯’ায়ী। এখানে আসলেই একদিন না একদিন চলে যেতে হয়। এটাই নিয়ম, এটাই স্বাভাবিক। সে চিরাচায়িত নিয়ম মেনেই আল্লামা দুবাগী ছাহেবকেও চলে যেতে হয়েছে। তাঁর গুণে মুগ্ধ হয়ে আজ যারা তাঁর প্রশংসা করছেন, তাঁর জন্য সওয়াব রেসানী ও দোয়া করছেন, একে একে তারাও সবাই এক সময় চলে যাবেন, কিš‘ তাঁর রেখে যাওয়া মসজিদ, মাদ্রাসা তথা সদকায়ে জারিয়া এবং বিশেষ করে ইসলাম ও সুন্নিয়তের প্রচার ও প্রসারে তিনি যে সমস্ত অমূল্য গ্র¯’াবলী রচনা করেছেন, সে সবের মাধ্যমে তিনি যুগযুগ ধরে বেঁচে থাকবেন এবং এর সাথে প্রিয় নবীজী (সা:) এর অমর বাণী বিধান প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে।

 

 

পরিশেষে মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করি যেন তিনি তাঁর এ প্রিয় অলীকে জান্নাতুল ফেরদাউস এর উ”চাসনে আসীন করেন, তাঁর খেদমতকে কিয়ামত পর্যন্ত জারী রাখেন এবং আমাদেরকে তাঁর পদাংক অনুসরণ করে দ্বীনের খেদমতে অগ্রগামী হওয়ার তওফিক দান করেন। আমীন।


error: Content is protected !!