ঢাকা, সোমবার, ২রা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
ঢাকা, সোমবার, ২রা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

বজ্রপাতে মৃত্যু ও কিছু ভূল ধারণা: বাকী বিল্লাহ

বাংলা শব্দ বজ্রর আরবি প্রতিশব্দ রা’দ। যে নামে পবিত্র কোরআনুল কারীমের ১৩ নং সুরাটির নামকরণ করা হয়েছে। বজ্র সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন, ‘বজ্র তারঁই তাসবিহ ও হামদ জ্ঞাপন করে এবং তাঁর ভয়ে ফেরেশতাগণও (তাসবিহরত রয়েছে)। তিনিই গর্জমান বিজলি পাঠান, তারপর যার ওপর ইচ্ছা একে বিপদরূপে পতিত করেন। আর তাদের (অর্থাৎ কাফিরদের) অবস্থা এই যে তারা আল্লাহ সম্পর্কেই তর্কবিতর্ক করছে, অথচ তাঁর শক্তি অতি প্রচন্ড’(সূরা রা’দ, আয়াত নং. : ১৩)।

 

বজ্রপাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রিয় নবী (সা.) আমাদের কিছু দোয়া শিখিয়েছেন। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) তাঁর বাবা থেকে বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) যখন বজ্রের শব্দ শুনতেন তখন তিনি বলতেন, ‘আলাহুম্মা লা তাকতুলনা বিগজাবিকা ওয়ালা তুহলিকনা বিআজাবিকা ওয়া আ—ফিনা কবলা জালিকা’ (তিরমিজি, হাদিস নং. : ৩৪৫০)।

 

অন্য রেওয়ায়েতে আছে, হজরত ইবনে আবি জাকারিয়া থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি বজ্রের আওয়াজ শুনে এ দোয়া পড়বে ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’ সে বজ্রে আঘাতপ্রাপ্ত হবে না (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস নং. : ২৯২১৩)।

 

 

বজ্রপাতে মৃত্যু কি শহীদি নাকি অভিশাপের :
বজ্রপাতে মৃত্যুকে কেউ কেউ শহীদি মৃত্যু বলে থাকেন। অথচ সহিহ বুখারী হাদীস নং ২৮২৯ এ বর্ণিত ৫ বা ৭ প্রকারের অথবা সুনানে আবু দাউদে যে ১০ প্রকারের শহীদি মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে সেখানে বজ্রপাতে মৃত্যুর কোন কথা উল্লেখ নেই। এ সম্পর্কে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, মুমিনের জন্য আকর্ষিক মৃত্যু হচ্ছে একটি ‘রহা’ বা প্রশািšতর । কেননা এর দ্বারা মুমিন আল্লাহর সানিধ্যে চলে যান, জান্নাতের পথে অগ্রসর হন বা দুনিয়ার কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়ে যান। সুতরাং বজ্রপাতে মৃত্যুকে শহীদি মৃত্যু বলার কোন অবকাশ নেই। অপরদিকে কেউ কেউ এই মৃত্যুকে ঠাডা পড়া মৃত্যু বা অভিশাপের মৃত্যুও বলে থাকেন যা একটি জঘন্যতম অপরাধ কেননা পবিত্র কোরআনুল কারীমে বা হাদীস গ্রন্থে কোথাও বজ্রপাতে মৃত্যুকে অপমৃত্যু বা আল্লাহর গজবের মৃত্যু বলা হয়নি সুতরাং যারা বজ্রপাতে মৃত্যুকে শহীদি মৃত্যু বা অভিশাপের মৃত্যু বলে আখ্যায়িত করছেন তার কোনটাই সঠিক নয় এবং এটা নিছক একটা কুসংস্কার মাত্র।

 

 

বজ্রপাতে মৃতের লাশ চুরি :
কখনো কখনো শোনা যায় বজ্রপাতে নিহত ব্যক্তির লাশ চুরি হয়ে যায়। বস্তুুত এখানে যেমন দুটি গুজব কাজ করছে তেমনি লাশ চুরি একটি ভয়াবহ অন্যায়ও । প্রথমত মনে করা হয় যে বজ্রপাতে নিহত ব্যক্তির শরীর প্রাকৃতিক চুম্বক বা মূল্যবান ধাতুতে পরিণত হয় অপরদিকে এ জাতীয় মৃত ব্যক্তিদের কিছু হাড় দিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সাধনা করলে অলৌকিক ক্ষমতা অর্জন করা যায় বা জাদু বিদ্যা করা যায়। যার কোনটারই কোনো সত্যতা নেই। এবং যার পুরোটাই অপ্রমানিত। আরো প্রচারিত আছে যে, যেখানে বজ্রপাত হয় তার আশেপাশে মূল্যবান খনিজ টুকরা পাওয়া যায়। এটাও শতভাগ ভিত্তিহীন।

 

দ্বিতীয়ত মৃত মানুষ জীবিত ব্যক্তির ন্যায় সমান সম্মানের কেননা ইসলামে একজন জীবিত ব্যক্তিকে যেমন অসম্মান করা নিষেধ তেমনি মৃত ব্যক্তির সঙ্গেও কোন প্রকারের মর্যাদাহানীকর আচরণ করা হারাম। হাদিস শরিফে তাই এরশাদ হয়েছে ‘মৃত লাশের হাড্ডি ভাঙ্গা জীবিত মানুষের শরীরের হাড্ডি ভাঙ্গার মতোই জঘন্য কাজ’ (আবু দাউদ শরিফ)। উপরন্তু মৃত ব্যক্তির লাশকে এতটাই শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়েছে যে, দীর্ঘদিনের কবরস্থ লাশ যা হয়তো মাটি হয়ে গেছে বা যার হাড়ও খঁুজে পাওয়া যাবে না সেই কবরকেও অসম্মান করা নিষেধ। হাদিসে এসেছে ‘তোমরা কবরের ওপর বোসো না’ (মুসলিম)। সুতরাং মৃত বা বজ্রপাতে মৃত যে কোন ব্যক্তির লাশই হোক তা চুরি থেকে বিরত থাকা একান্ত অপরিহার্য।

 

 

কিছু ভুল ধারণা :
১. অনেক মুরুব্বি বা অনেকেই বলে থাকেন যে, ব্রিটিশ আমলে সীমানা প্রাচীর স্থাপন করা হয়েছিল যা বাজকে (বজ্র) নিজের ভিতর আকর্ষণ করত ফলে তখন বাজ কম পড়ত। বস্তুত নিদিষ্ট কোন এলাকার কোন একটি উচঁু জায়গায় সাধারণত বাজ পড়ে যেমন : গ্রামের উচু তালগাছ, বটগাছ, খোলা মাঠে একা দাড়িয়ে থাকা মানুষ, গরু, উচু বিলিং, রাস্তার ল্যাম্পপোষ্ট, মোবাইল টাওয়ার ইত্যাদি। সুতরাং ব্রিটিশদের স্থাপিত সীমানা পিলার চুরি হওয়াতে এখন বজ্রপাত বেশী হয় এ ধারণা ঠিক নয়।

 

২. অনেকে বলে থাকেন, দেহে কোন ধাতব বস্তুু থাকলে তা বজ্রকে আকৃষ্ট করে। এ ধারণাও সঠিক নয় কেননা ব্যাটারি চালিত হাত ঘড়ি বা কোন স্বর্ণালংকার কোনভাবেই বজ্রপাতকে আকৃষ্ট করে না।
৩. অনেকেই মনে করেন যে বজ্রের বিদ্যুতে পুড়ে ব্যক্তি মারা যায়। বস্তুত দেখা গেছে যে বজ্রপাতে সরাসরি আক্রান্ত ব্যক্তি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়না ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বজ্রপাতে মৃত ব্যক্তির শরীরে মারাত্নক কোন পোড়ার ক্ষত পাওয়া যায় না। বস্তুত বজ্রপাতে মৃত্যুর পেছনে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য যে কারণটি রয়েছে তাহলো বজ্রপাতে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের উপরিভাগ দিয়ে প্রবাহিত হওয়া উচ্চ মাত্রার বৈদ্যতিক ভোল্টের কারণে স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতা মারাত্নকভাবে বাধাগ্রন্থ হওয়া এবং ফুসফুসের কার্যকারিতা হ্রাস পেযে শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে ব্যক্তির মারা যাওয়া।

 

 

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্নিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের প্রবল পরাক্রমশালী প্রভু বলেছেন, যদি আমার বান্দারা আমার বিধান মেনে চলত, তবে আমি তাদের রাতের বেলায় বৃষ্টি দিতাম, সকালবেলায় সূর্য দিতাম এবং কখনো তাদের বজ্রপাতের আওয়াজ শোনাতাম না (মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং. : ৮৭০৮)। সুতরাং আল্লাহ্তায়ালা তার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আমাদের তাঁর এবং তাঁর রাসুল (সা.) এর যেভাবে আনুগত্য করা উচিত আল্লাহ্তায়ালা আমাদের সেভাবে ইবাদত করার তৌফিক দান করুন এবং বজ্রপাতসহ সকল বিপদ থেকে আমাদের হেফাযত করুন, আমিন।

 

 

সহায়ক প্রবন্ধ ও উৎস সমূহ :
১. কুরআন—সুন্নাহর আলোকে বজ্রপাত ও করণীয় — মো. মোশারফ হোসেন
২. কোরআন—হাদিসে বজ্রপাত প্রসঙ্গ — মুফতি সাদ তাশফিন
৩. বজ্রপাত ও কিছু বিভ্রান্তি — ড.এম.এ. ফারুখ
৪. কোরআন—হাদিসে বজ্রপাত প্রসঙ্গ — মুফতি মুহাম্মদ মতুর্জা
৫. বজ্রপাতে মৃত্যু কি অভিশাপ নাকি শহীদের মৃত্যু — শায়খ আহমাদুল্লাহ


error: Content is protected !!