ঢাকা, সোমবার, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
ঢাকা, সোমবার, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

শরীয়তপুরে পদ্মার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৮০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে! তলিয়ে গেছে অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

শরীয়তপুর প্রতিনিধি: ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে শরীয়তপুরে পদ্মা নদীর পানি। গেল ২৪ ঘন্টায় আরো ১৯ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে সুরেশ্বর পয়েন্টে পদ্মার পানি বিপদসীমার ৮০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

 

পানিবন্ধি হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। এতে পদ্মা তীরবর্তী জাজিরা ৭টি, ভেদরগঞ্জে-৩টি সহ নড়িয়া উপজেলার ৬টি ও একটি পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গেল এক সপ্তাহ আগেও পদ্মা নদীর পানি ক্রমশই কমছে ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে এক সপ্তাহ যাবত পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। গেল ২৪ ঘন্টায় উজানের ঢোলের পানি নেমে আসায় বৃদ্ধি পাচ্ছে পদ্মা নদীর পানি। গতকাল সন্ধ্যায় আরও ১৯ সেন্টিমিটার বেড়ে শরীয়তপুরে পদ্মা নদীর পানি সুরেশ্বর পয়েন্টে বিপদসীমার ৮০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানান পানি উন্নয়ন বোর্ড।

ইতিমধ্যে এসব এলাকায় পানি প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষ। তলিয়ে গেছে নড়িয়া-জাজিরা আঞ্চলিক মহা সড়ক সহ বিভিন্ন এলাকার কাচাঁ-পাকা অনেক রাস্তা। নিচু এলাকার অনেক বাড়ী-ঘরেও ঢুকেছে বন্যার পানি। সাঁপ-বিচ্ছু ও পোকা-মাকড়ের ভয়ে আতংকে দিন কাটছে তাদের। এরই মধ্যে অনেকের বসতঘর, রান্নাঘর, গভীর নলকূপ ও শৌচাগার তলিয়ে অনেক সমস্যায় দিন কাটাচ্ছেন তারা। এছাড়া তলিয়ে গেছে প্রায় অর্ধশত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১২ সেপ্টেম্বর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার কথা থাকলেও তলিয়ে যাওয়া এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন।

এছাড়া বেশকিছু স্থানে অব্যাহত রয়েছে নদী ভাঙণ। জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলে ভাঙণ রোধের কাজ করে যাচ্ছে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড। এদিকে উপজেলা প্রশাসন জানিছেন পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তা মজুদ ও বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র সহ সব ধরনের প্রস্তুত রয়েছে তাদের।

 

মোক্তারের চর ইউনিয়ন পোড়াগাছা এলাকার পানিবন্দি মমতাজ বেগম জানান, হঠাৎ করে কয়েকদিন যাবত পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তার বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে গেছে। উঠোনে শাখা এবং ঘরের মধ্যে মাচা পেতে অনেক কষ্টে সাব্বির আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন তিনি। সময় তিনি আরো বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো মেম্বার চেয়ারম্যান আমার খোঁজ খবর নেয় নাই। হাঁস মোরগ নিয়ে অনেক কষ্টে আছি। সরকার যদি একটু সাহায্য সহযোগিতা করত তাহলে ভালো হতো।

ঈশ্বর কাঠি গ্রামের মুদি দোকানদার মোকলেছ ছৈয়াল বলেন, গত কয়েক দিন যাবত পানি বাড়ায় আমার দোকান এবং দোকানের পাশের রাস্তা তলিয়ে গেছে। বাড়িতেও পানি উঠছে। রাস্তা দিয়ে আসা-যাওয়া করতে অনেক সমস্যা হয়। রাস্তার অনেক জায়গায় ভেঙে গর্ত হয়ে গেছে। লোকজন বাড়ি থেকে বের হতে পারে না। তাই দোকানে তেমন বেচা কিনিও নেই। অনেক সমস্যার মধ্যে আছি।

 

জাজিরা উপজেলার বিলাশপুর ইউনিয়নের রিস্কা চালক স্বপন জানান, কয়েকদিনের পানিতে বাড়িঘর রাস্তাঘাট সব তলিয়ে গেছে। বিভিন্ন রাস্তা ঘাটে পানি উঠে যাওয়ায় গাড়ি নিয়ে বের হতে পারি না। কাজকাম কমে গেছে। অনেক সমস্যার মধ্যে আছি।

 

শরীয়তপুরের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন পদ্মার দ্বীপ অঞ্চল ইউনিয়নের নদীভাঙ্গা ক্ষতিগ্রস্ত আলী আহমদ জানান, প্রতিবছরই আমাদের নদীতে ভাঙ্গে। ভাঙতে ভাঙতে জায়গা জমিন সব নদীগর্ভে চলে গেছে। সর্বশেষ এইবারই টুকরো ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে। ঘর দুয়ার ভেঙে সরায়ে বাবুরচর বাজারের পাশে নিয়ে রাখছি। সেখানেই কোনমতে আছে এখন। আর যেদিন ভাঙলে বাপের ভিটা টা চলে যাবে। শেষ সম্বল বাপের ভিটা চলে গেলে কোথায় থাকব জানিনা। আমাদের ত্রাণ বা অন্য কোনো সহায়তা লাগবেনা। তবুও চাই আমাদের এই এলাকা টান সরকার যেন বেরিবাধ দিয়ে আমাদেরকে শেষ রক্ষা করেন।

 

মোক্তারের চর ইউনিয়নের দেলোয়ার চোকদার বলেন, এই তো কিছুক্ষণ আগে ফজরের নামাজ পড়ে হাঁটতে বের হয়েছি। তখনও আমার বাড়িতে ঢোকার রাস্তাটা শুকনো ছিল। কিছুক্ষণ হেঁটে এসে বাড়িতে ঢোকার সময় দেখি রাস্তাটা চলে গেছে। এখন পানি পাড়িয়ে বাড়িতে যেতে হচ্ছে। এরকম বাড়তে থাকলে দু-একদিনের মধ্যে আশপাশের যতবারই ঘর আছে সব তলিয়ে যাবে।

 

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানান, নড়িয়া ও জাজিরা উপজেলার কিছু কিছু বিদ্যালয়ের মাঠে এবং মেঝেতে, শ্রেণিকক্ষে পানি উঠেছে। অনেক জায়গায় বিদ্যালয় বিদ্যালয়ে যাতায়াতের রাস্তা চলে গেছে। বন্যার পানি নেমে না গেলে এসব বিদ্যালয় আপাতত ক্লাস করা সম্ভব হবে না।

 

শরীয়তপুর জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবীব জানান, এক সপ্তাহ আগেও পানি কমতি ছিল। উজানের ঢলের পানি নেমে এসে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৮০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে পদ্মা তীরবর্তী যেসকল নিচু এলাকা রয়েছে সেসব এলাকা সহ আশপাশের অনেক এলাকা তলিয়ে গেছে। এই পানিটা আরো কিছুদিন বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং তারপরে ধীরে ধীরে কমতে থাকবে। এছাড়া শরীয়তপুরের পদ্মা নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথেই বেশ কিছু স্থানে নদী ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। সব জায়গাতেই আমরা জিও ব্যাগ, জিও টিউব ফেলে বাঙালি রদের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। পদ্মার ডান তীরের যেসকল নতুন নতুন জায়গায় ভাঙ্গন শুরু হয়েছিল সেগুলো ইতিমধ্যে রোধ করা সম্ভব হয়েছে। তবে কুন্ডেরচর এলাকার মাটি বালু বিশিষ্ট হওয়ায় এবং পানির স্রোত বেশি থাকায় সেখানে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবু আমরা চেষ্টা করছি অনুরোধ করার জন্য।

 

জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, হঠাৎ করে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথেই পদ্মার তীরবর্তী জাজিরা উপজেলার প্রায় ৭ টি ইউনিয়নে পানি ঢুকে প্লাবিত হয়েছে এবং বেশ কিছু স্থানে নদী ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহায়তায় বেশিরভাগ স্থানে নদী ভাঙ্গন রোধ করা সম্ভব হলেও কুন্ডেরচর ইউনিয়নের ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে। নদীর স্রোত বেশি থাকায় সেখানে কাজ করতে পারছে না পানি উন্নয়ন বোর্ড তবে শিগগিরই সেখানে ভাঙ্গন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া আমাদের সকল বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র গুলো প্রস্তুত রয়েছে। পানি যদি আরো বাড়তে থাকে তাহলে বেশি সমস্যা গ্রস্ত পরিবারগুলোকে আমরা বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তর করব। ইতিমধ্যে আমরা নদীভাঙ্গা এবং বন্যা কবলিত দের মাঝে ত্রাণ সহায়তা বিতরণ করেছি। আমাদের আরো পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা মজুদ রয়েছে প্রয়োজন হলে বিতরণ করতে পারব।


error: Content is protected !!