ঢাকা, সোমবার, ২রা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
ঢাকা, সোমবার, ২রা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সংগ্রামের সিঁড়ি বেয়ে গৌরবের ৭৩ বছরে আওয়ামীলীগ

ভাষা আন্দোলনে প্রেরণাদাতার গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
দেশের বৃহত্তম ও প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আন্দোলন, সংগ্রাম, ঐতিহ্য ও সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে ৭৩ বছরে পদার্পণ করেছে দলটি। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী রোজ গার্ডেনে আত্মপ্রকাশ ঘটে আওয়ামী লীগের। দীর্ঘ পথচলায় রক্তের আখরে লেখা দলটির সংগ্রাম ও সাফল্যের ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতাসহ অগণিত নেতাকর্মীর আত্মদানে সমৃদ্ধ আওয়ামী লীগ। লক্ষ্য একটি সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গঠন ও বিশ্বের বুকে আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করা।

 

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং ভ্রান্ত দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে জন্ম হয় পাকিস্তান রাষ্ট্রের। এরপর বাঙালি জাতির ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার, নির্যাতন, চরম অবেহলা ও দুঃশাসনে নিষ্পেষিত বাংলার জনগণের মুক্তি ও অধিকার আদায়ে প্রতিষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগ। ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন ঢাকার কেএম দাস লেনে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘রোজ গার্ডেন’ প্রাঙ্গণে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুসারী মুসলিম লীগের প্রগতিশীল কর্মীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দলটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। সংগঠনটির প্রথম কমিটিতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি ও শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং জেলে থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন।

 

 

স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ধর্মনিরপেক্ষ-অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, শোষণমুক্ত সাম্যের সমাজ নির্মাণের আদর্শ এবং একটি উন্নত সমৃদ্ধ আধুনিক, প্রগতিশীল সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা বিনির্মাণে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দর্শনের ভিত্তি রচনা করে আওয়ামী লীগ। যার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৫৫ সালের কাউন্সিলে অসাম্প্রদায়িক নীতি গ্রহণের মাধ্যমে সংগঠনটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’।

 

 

আওয়ামী লীগ শুধু এ দেশের প্রাচীন ও সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠনই নয়, বাংলাদেশের রাজনীতির মূলধারাও। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও আওয়ামী লীগের ইতিহাস একসূত্রে গাঁথা।

 

সমৃদ্ধ: বঙ্গবন্ধু, চার নেতাসহ অগণিত কর্মীর আত্মদানে

রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা ও স্বীকৃতি

১৯৪৮ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সূচিত ভাষা আন্দোলন ১৯৫২ সালে গণজাগরণে পরিণত হয়। অব্যাহত রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার তরুণ সংগ্রামী জননেতা শেখ মুজিবুর রহমান সেই সময়ে কারান্তরীণ থেকেও ভাষা আন্দোলনে প্রেরণাদাতার গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেন।

 

 

আওয়ামী লীগের উদ্যোগেই মাতৃভাষা বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষার আনুষ্ঠানিক মর্যাদা লাভ করে। ২১ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত হয় শহীদ দিবস। আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নির্মাণকাজ প্রায় সম্পন্ন হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলা একাডেমি।

 

 

প্রাদেশিক পরিষদে জয়

লক্ষ্য: ‘সোনার বাংলা’ ও আত্মমর্যাদাশীল জাতি গঠন

ভাষা আন্দোলনে বিজয়ের পটভূমিতে ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের কাছে মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয় হয়। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব থেকে দূরে রাখা হয়। নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে ১৯৫৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে প্রদেশে কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগ সরকার নিশ্চিত করে এক মুক্ত-গণতান্ত্রিক পরিবেশ।

 

 

মাত্র ২০ মাসের রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়ে চরম খাদ্যাভাব ও দুর্ভিক্ষ থেকে বাঙালি জাতিকে রক্ষা করাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকার যে সফলতা দেখায়, তাতে জনগণের কাছে এ দলের জনপ্রিয়তা বহুগুণ বেড়ে যায়।

 

 

আন্দোলন-সংগ্রামের পথ ধরে স্বাধীনতা

সে সময় মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করে জনগণের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

 

 

এরপর আইয়ুব খানের এক দশকের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬২ ও ’৬৪ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ, ’৬৬ সালের ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন, ’৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ’৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ছয় দফাভিত্তিক ’৭০ সালের নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয়, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ খ্যাত কালজয়ী ভাষণ ও পরবর্তীতে পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন, ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যার পর ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাঙালি জাতি স্বাধীন জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

 

 

১৯৮১ সালের ১৭ মে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দেশে ফেরেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা

অবশেষে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের।

 

স্বাধীন বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড

স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্যের রূপকার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বাঙালি জাতির স্বতন্ত্র জাতি-রাষ্ট্র ও আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সুমহান ঐক্যের প্রতীক। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বঙ্গবন্ধুর সরকার স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে যখন অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে এগিয়ে নিতে নিবেদিত, ঠিক তখনই স্বাধীনতাবিরোধী চক্র আন্তর্জাতিক অপশক্তির সহায়তায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাসহ জাতীয় চারনেতা হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার চতুর্মুখী ষড়যন্ত্র করা হয়।

 

 

নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা

১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে দলের সভাপতি নির্বাচিত হন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। দীর্ঘ ছয় বছরের নির্বাসন শেষে ১৯৮১ সালের ১৭ মে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে শেখ হাসিনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নবোদ্যমে সংগঠিত হন। জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙালি জাতির হারানো গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের এক নবতর সংগ্রামের পথে যাত্রা করে আওয়ামী লীগ।

 

 

আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পথপরিক্রমায় অনেক অশ্রু, ত্যাগ আর রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতি ফিরে পায় ‘ভাত ও ভোটের অধিকার’। দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা। এখন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে ও সুদক্ষ রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসন, স্থিতিশীল অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, উন্নয়নে গতিশীলতা, ডিজিটালাইজেশন, শিক্ষার প্রসার, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, কর্মসংস্থান, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, খাদ্যনিরাপত্তা, নারীর ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুগান্তকারী উন্নয়ন বিশ্বের বুকে বাংলাদেশকে একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে উন্নীত হয়েছে।

 

 

স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নসূত্র

সুধীজনরা মনে করেন, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা দিবস অর্থাৎ ২৩ জুনই মূলত অঙ্কুরিত হয় ‘স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নসূত্র’। দিবসটি বাঙালি জাতির জীবনে অত্যন্ত গৌরবের। এ বছর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দিবসটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

 

 

আওয়ামী লীগের প্রত্যাশা ছিল, জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ও সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় উদযাপন করা হবে। কিন্তু বাংলাদেশসহ সারাবিশ্ব দীর্ঘসময় ধরে করোনাভাইরাসের করালগ্রাসে বিপন্ন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলায় কাজ করছে।

 

 

আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখে সব নেতাকর্মী এবং সমর্থক শত প্রতিকূলতা ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে আওয়ামী লীগকে আজ শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে। আওয়ামী লীগের লক্ষ্য দেশকে জাতির পিতার স্বপ্নের ‘সোনার বাংলাদেশ’ এবং বাঙালি জাতিকে বিশ্বের বুকে একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।


error: Content is protected !!