ঢাকা, শুক্রবার, ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
ঢাকা, শুক্রবার, ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
সাংবাদিক মুজাক্কির হত্যা

ছেলের পাঞ্জাবি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন মা

ছেলে মুজাক্কিরের পছন্দের পাঞ্জাবি হাতে নিয়ে কখনো বসছেন, কখনো দাঁড়াচ্ছেন মা মমতাজ বেগম; কখন মুজাক্কির ফিরবে সেই অপেক্ষায়। সে ফিরলেই তাকে পাঞ্জাবি পরিয়ে বুকে টেনে নেবেন মা। কিন্তু তাঁর এই বুকের ধন যে আর জীবিত ফিরবে না, মা তা জানেন না। অবশ্য বাড়িতে এত মানুষের আনাগোনা দেখে একসময় হয়তো তিনি বুঝে গেলেন, ছেলে আর পৃথিবীতে নেই! তাই তাঁর চোখ দিয়ে অনর্গল ঝরছিল জল। এরপরই পাঞ্জাবি নিয়ে দিগ্বিদিক ছুটছিলেন তিনি। আর বিলাপ করে চাইছিলেন ছেলে হত্যার বিচার।

 

এ দৃশ্য গতকাল রবিবার বিকেলে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত সাংবাদিক বোরহান উদ্দিন মুজাক্কিরের গ্রামের বাড়ি চরকাঁকড়ার।

 

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরফকিরা ইউনিয়নের বাদশা মিয়া বাড়ির নোয়াব আলী মাস্টারের ছেলে মুজাক্কির। সাত ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট আদরের মুজাক্কির নোয়াখালী কলেজে ইতিহাসে স্নাতক (সম্মান) শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক বাংলা সমাচারের কোম্পানীগঞ্জ প্রতিনিধি মুজাক্কির অনলাইন পোর্টাল বাংলা ইনসাইডারেও কাজ করতেন।

 

গত শুক্রবার বিকেলে চাপরাশিরহাট বাজারে বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। মুজাক্কির মোবাইল ফোনে তা লাইভ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। দ্রুত তাঁকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখানে শনিবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

 

পরিবারের সদস্যরা জানান, মুজাক্কির বোনের বাড়িতে থেকে সাংবাদিকতা করতেন। ছোট ছেলে হিসেবে মায়ের সঙ্গে তাঁর ছিল দারুণ সখ্য। মুজাক্কিরের বাবা নোয়াব আলী বলেন, ‘আমার বয়স ৭৫ চলছে। মুজাক্কিরের মাও বয়োবৃদ্ধ। কিছুদিন আমাদের বয়সের কথা চিন্তা করে নতুনভাবে একটি পারিবারিক কবরস্থান তৈরি করি। কিন্তু আজ আমরা সবাই রয়ে গেলাম। পরিবারে সবার ছোট আমার মুজাক্কির সবার আগে ওই কবরস্থানে দাফন হয়ে যাচ্ছে। পারিবারিক কবরস্থানের প্রথম অতিথি মুজাক্কির আজ বিদায় নেবে! এ শোক পিতা হিসেবে আমি কিভাবে সইব! কবরস্থানটি মুজাক্কিরের নামে নামকরণ করব। এ ধরনের মৃত্যু আর কোনো পিতা-মাতার জন্য না আসুক, এ প্রত্যাশা মহান আল্লাহর কাছে।’ গত রাত সাড়ে ৮টায় মুজাক্কিরকে স্থানীয় আজগর আলী মাদরাসায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

 

সাবেক কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদল বলেন, মুজাক্কির তাঁর সমর্থক ছিলেন। তাঁকে পছন্দ করতেন বলে কাদের মির্জার সন্ত্রাসীদের গুলিতে মোবাইল ফোনে ভিডিও করতে গিয়ে তাঁকে অকালে প্রাণ দিতে হলো। তিনি হত্যাকারীদের বিচার দাবি করেন।

 

কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মির জাহিদুল হক রনি জানান, মুজাক্কিরকে দাফনের পর তাঁর পিতা এসে মামলা দেবেন বলে জানিয়েছেন।

 

এদিকে মুজাক্কির হত্যার প্রতিবাদে গতকাল নোয়াখালী প্রেস ক্লাবসহ বিভিন্ন উপজেলায় সাংবাদিকরা মানববন্ধন ও সমাবেশ করে অবিলম্বে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারসহ বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।

 

ছাত্র অধিকার পরিষদের সমাবেশ

 

নোয়াখালী প্রেস ক্লাবের সামনে বিকেলে মুজাক্কির হত্যার প্রতিবাদে ও বিচার দাবিতে সমাবেশ করেন ছাত্র অধিকার পরিষদ ও যুব অধিকার পরিষদ নোয়াখালী জেলা শাখা। তাঁরা হত্যায় জড়িতদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন। এ সময় জেলায় কর্মরত সাংবাদিকদের প্রতিনিধিরা সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করেন ও বক্তব্য দেন। সমাবেশে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুজ জাহের, জেলা যুগ্ম আহ্বায়ক আবু হোসেন ফরহাদ, বাংলাদেশ যুব অধিকার পরিষদ নোয়াখালী জেলা সমন্বয়ক মো. রুবেল হোসেন প্রমুখ।

শরীরে শটগানের গুলির অসংখ্য ছিদ্র

 

এদিকে নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা জানান, শটগানের গুলিতে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মৃত্যু হয়েছে বোরহান উদ্দিন মুজাক্কিরের। গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে লাশের ময়নাতদন্ত শেষে এ কথা জানান ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডা. প্রদীপ বিশ্বাস। তিনি বলেন, ময়নাতদন্তে মুজাক্কিরের মুখ, গলা ও বুকে অসংখ্য ছিদ্র পাওয়া গেছে। এগুলো শটগানের ইনজুরি। গুলিতে তাঁর ফুসফুস ও রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

ময়নাতদন্ত শেষে মুজাক্কিরের লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান স্বজনরা।


error: Content is protected !!