ঢাকা, শুক্রবার, ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
ঢাকা, শুক্রবার, ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
নমনীয় কাদের মির্জা অনুসারীদের বললেন

কেউ মারলে আমাকে বলবেন, কারো গায়ে হাত দেবেন না

এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দলের বেশ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে সোচ্চার নোয়াখালীর বসুরহাট পৌরসভার মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল কাদের মির্জা অবশেষে নমনীয় হয়েছেন। তিনি সব কর্মসূচিও প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। গতকাল বসুরহাটে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে নিজের অনুসারীদের শান্ত থাকার নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, ‘কেউ মারলে আমাকে বলবেন, কারো গায়ে হাত দেবেন না।’

 

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বিরুদ্ধে কাদের মির্জার ধারাবাহিক বিষোদগার, হরতাল ও বিক্ষোভ সমাবেশের কর্মসূচি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। ক্ষুব্ধ নেতারা তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও প্রশাসনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেন। এতে অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েন কাদের মির্জা।

 

এরই মধ্যে বসুরহাটে সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে স্থানীয় একজন সাংবাদিক চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের দাবিতে গতকাল রবিবার মাঠে নেমেছেন ওই অঞ্চলের সাংবাদিকরা।

 

গতকাল সকালে কাদের মির্জা তাঁর অনুসারীদের নিয়ে বসুরহাট বাজারে একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন। সেখানে তিনি বসুরহাটের পরিস্থিতি, শনিবার রাতে তাঁকে আওয়ামী লীগ থেকে অব্যাহিত দিয়ে জেলা কমিটির সুপারিশ ও পরে সেটা প্রত্যাহার করা নিয়ে কথা বলেন। সমাবেশে নিজের অনুসারীদের উদ্দেশে কাদের মির্জা বলেন, ‘একরামের অস্ত্র নিয়ে বাদল তাঁর অনুসারীদের নিয়ে আমাদের ওপর গুলি চালিয়েছে। গুলিতে একজন সংবাদকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। আমার নেতার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়েছে। আমাকে বহিষ্কার করেছিল একরাম (নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ একরামুল করিম চৌধুরী), নেত্রী (শেখ হাসিনা) সঙ্গে সঙ্গে বলেছেন এটি প্রত্যাহার করার জন্য। সঙ্গে সঙ্গে তা প্রত্যাহার করা হয়েছে। নেত্রীর ওপর আমার বিশ্বাস আছে। আপনারা কেউ আইন হাতে তুলে নেবেন না। এখানে অপরাজনীতি থাকবে না, কেউ কারো গায়ে হাত দেবেন না। আপনাদের কেউ মারলে আমাকে বলবেন। কোনো মারামারি করবেন না।’

 

এর আগে শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে কাদের মির্জা নিজের ফেসবুক আইডি থেকে লাইভে এসে এবং ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে পূর্ব ঘোষিত হরতালসহ সব কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। ফেসবুক লাইভে তিনি বলেন, ‘আমি রাজনীতি করি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের, আমি রাজনীতি করি আওয়ামী লীগের। আমি শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল, আমার নেত্রী শেখ হাসিনা যখন যে সিদ্ধান্ত দেবেন সে সিদ্ধান্ত আমি মাথা পেতে নেব। নেত্রী যেহেতু বলেছেন নোয়াখালীর বিষয়ে তিনি প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন, সে জন্য আমি এরই মধ্যে আমার দেওয়া সব কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নিয়েছি এবং আমি চাই নোয়াখালী আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাকর্মীরা যেন দলে স্থান পায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘রাজনীতির চলমান সংকট নিরসনে আমাদের সকলের আস্থার শেষ ঠিকানা জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে আমাদের এর আগে ঘোষিত সব ধরনের কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নিলাম। আশা করি জননেত্রী শেখ হাসিনা ও আমাদের নেতা জনাব ওবায়দুল কাদের সাহেবের হস্তক্ষেপে সব সমস্যার সমাধান অতি শিগগিরই হবে।’

 

সাংবাদিক হত্যার বিচার দাবি

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মুজাক্কিরের খুনিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন জেলা ও বিভিন্ন উপজেলায় কর্মরত স্থানীয় সাংবাদিকরা। নোয়াখালী, কোম্পানীগঞ্জ ও চাটখিল প্রেস ক্লাব মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করে। কর্মসূচিতে সাংবাদিক ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সংহতি প্রকাশ করে।

 

গতকাল দুপুর ১২টার দিকে আয়োজিত নোয়াখালী প্রেস ক্লাবের মানববন্ধনে বক্তারা মুজাক্কির খুনের সঙ্গে জড়িত সব আসামিকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। তাঁরা হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন। লাশ নিয়ে যেন কেউ রাজনীতি করতে না পারে সে ব্যাপারেও হুঁশিয়ারি দেন তাঁরা। অন্যথায় কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে বলেও ঘোষণা দেন বক্তারা।

 

সাংবাদিক নেতারা বলেন, আগেও অনেক সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনার সুষ্ঠু বিচার না হওয়ায় এ ধরনের সহিংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।

 

মানববন্ধনে বক্তব্য দেন নোয়াখালী জেলা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি বখতিয়ার শিকদার, দৈনিক ইত্তেফাকের জেলা প্রতিনিধি ও প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি আলমগীর ইউসুফ, প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও দেশ রূপান্তরের জেলা প্রতিনিধি জামাল হোসেন বিষাদ, ইন্ডিপেনডেন্ট টিভির জেলা প্রতিনিধি আবু নাছের মঞ্জু, এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজের জেলা প্রতিনিধি ফুয়াদ হোসেন, প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক মাহবুবুর রহমান প্রমুখ।

 

এর আগে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে কোম্পানীগঞ্জ প্রেস ক্লাব। উপজেলার বসুরহাট বাজারের বঙ্গবন্ধু চত্বরে এ মানববন্ধন হয়। এতে বক্তব্য দেন কোম্পানীগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান ইমাম রাসেল ও সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন রনি, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি এইচ এম মান্নান মুন্না ও সহসভাপতি মেজবাহ উদ্দিন। তাঁরা বুরহান নিহত হওয়ার ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবির পাশাপাশি তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। মানববন্ধন শেষে মিছিল নিয়ে সাংবাদিকরা বাজারের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করেন।

 

চাটখিল পৌর শহরের প্রধান সড়কে উপজেলা প্রেস ক্লাব ও সাংবাদিক ফোরাম সমাবেশ করে। প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কামরুল কাননের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন প্রেস ক্লাবের সভাপতি মিজানুর রহমান বাবর, সাংবাদিক ফোরাম সভাপতি আবু তৈয়ব, সাংবাদিক ইয়াছিন চৌধুরী প্রমুখ।

 

উল্লেখ্য, শুক্রবার বিকেল ৫টার দিকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরফকিরা ইউনিয়নের চাপরাশিরহাট পূর্ববাজার এলাকায় আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষ চলাকালে চিত্র ধারণের সময় গুলিবিদ্ধ হন সাংবাদিক মুজাক্কির। গুরুতর অবস্থায় প্রথমে তাঁকে ২৫০ শয্যার নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার রাত পৌনে ১১টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।


error: Content is protected !!