ঢাকা, বুধবার, ১২ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ২৯শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
ঢাকা, বুধবার, ১২ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ২৯শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

বেনাপোল পৌর ট্রাক টার্মিনাল ; দেদার্ছে চলছে চাঁদাবাজি

ইয়ানূর রহমান : দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল বন্দরের প্রবেশমুখে চলছে চাঁদাবাজির মহোৎসব। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা আমদানি-রফতানিমুখী পণ্যবাহী ট্রাক জোর করে বেনাপোল পৌর ট্রাক টার্মিনালে ঢুকিয়ে ট্রাক প্রতি আদায় করা হচ্ছে ১শ’ টাকা। এতে চালকরা যেমন ভোগান্তির শিকার হচ্ছে তেমনি বাণিজ্যে নেমে এসেছে ধীরগতি। করোনা মহামারীর সময়ে বেনাপোল পৌর কর্তৃপক্ষের এমন বৈরি আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এ বন্দর ব্যবহারকারি ট্রাক চালক ও বাণিজ্যিক সংগঠনগুলোর নেতারা। তবে বেনাপোল পৌর কর্তৃপক্ষ বলেছেন, পৌর শহরের যানযট মুক্ত রাখতে এবং ট্রাক চালক ও সহযোগীদের সেবা প্রদান বাবদ নেয়া হচ্ছে ১০০ টাকা সেবা ফি।

জানাযায়, বর্তমান করোনা মহামারির সময় চলমান লকডাউনে দেশের গণপরিবহনসহ অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। কিন্তু দেশের শিল্পকলকারখানায় উৎপাদন ও সরবরাহ সচল রাখতে লকডাউনের আওতামুক্ত রাখা হয় বন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম। ফলে, এপথে দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রফতানি ও বন্দর থেকে পণ্য খালাস প্রক্রিয়া সচল রয়েছে। এপথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় দেড়শ’ ট্রাক পণ্য ভারতে রফতানি হয়, আমদানি পণ্য নিতে আসে প্রায় ৪শ’ ট্রাক। রফতানি পণ্য বেনাপোলে প্রবেশ করেই বন্দরের ট্রাক টার্মিনালে ঢোকে। বন্দরের টার্মিনাল চার্জ দিয়ে চলে যায় ভারতে। যে সকল ট্রাক বন্দরে আসে সব ট্রাকই ভারতে ঢুকে
যায়। কিন্তু হঠাৎ করে এ মহামারির সময় বেনাপোল পৌর ট্রাক টার্মিনাল উদ্বোধন করা হয়। আমদানি-রফতানিমুখী পণ্যবাহী ট্রাক মহাসড়ক থেকে ধরে নিয়ে ঢোকাচ্ছে পৌরসভার ট্রাক টার্মিনালে। পরে ট্রাক প্রতি ১শ’ টাকা চাঁদা আদায় করে ছাড়পত্র দিচ্ছে। এতে দুইবার টার্মিনালে প্রবেশ করতে যেয়ে দীর্ঘ সময়
ক্ষেপনে মারাত্মকভাবে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে ব্যহত হচ্ছে। যেকারণে ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করে বলেছেন, একটি কুচক্রী মহল বেনাপোল পৌর ট্রাক টার্মিনালটি বনগাঁর কালিতলা ট্রাক টার্মিনালের মতো চালকদের জিম্মি করে অর্থ বাণিজ্যের ফাঁদ পেতেছে। যেখানে অতিবাহিত করা হয় ১৫ থেকে ২০ দিন।

বেনাপোল বন্দরের ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ীরা বলেন, বিশ^ব্যাপী মহামারি করোনা মোকাবেলায় প্রত্যেক দেশ যেখানে টানা ১ বছর যাবত হিমশিম খাচ্ছে, সেসময়ে বাংলাদেশের বৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলে চলছে চাঁদাবাজির মহোৎসব।

স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কয়েকশ’ পণ্যবাহী ট্রাক বেনাপোল বন্দরে আমদানিকৃত পণ্য আনা-নেয়া করতে আসলে তাদেরকে পথ গতিরোধ করে বেনাপোল পৌর ট্রাক টার্মিনালে ঢুকিয়ে আদায় করা হয় ১০০ টাকা চাঁদা। কেউ দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তাদেরকে বিভিন্ন ভাবে অত্যাচার করা হয়।

বেনাপোল বন্দরে রফতানি পণ্য নিয়ে আসা ট্রাক চালক মনির হোসেন বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পণ্যবাহী ট্রাক নিয়ে তারা বেনাপোল বন্দরের ট্রাক টার্মিনালে ঢোকেন। পরে সেখান থেকে সরাসরি ভারতে গিয়ে পণ্য খালাস করে ফেরেন। আবার এ ট্রাক যদি পৌর ট্রাক টার্মিনালে ঢোকানো হয় এতে কেবল চালকদের অর্থদণ্ড হবে না, সময় ক্ষেপনে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে ধীরগতি হচ্ছে।

কথা হয় বেনাপোল পৌর ট্রাক টার্মিনালের টোল ইজারাদার মোহাম্মাদ আলীর সাথে। তিনি বলেন, ২০২০ সালে পৌর ট্রাক টোল আদায় ইজারার সর্Ÿোচ্চ দরদাতা হয়ে ইজারা মূল্য ৪২ লাখ ১শ’ টাকা ও ইজারা মূল্যের উপর ১৫% ভ্যাট ও ৫% আইটি পরিশোধ করি। যার শুরুতে করোনা ভাইরাসের প্রাদূর্ভাবে টোল আদায় স্থগিত রাখা হয়। পরবর্তীতে গত ১৩ এপ্রিল/২১ দেশের বৃহত্তম স্থল বন্দর বেনাপোল পৌর এলাকার যানজট নিরসনের জন্যে বেনাপোল পৌরসভার উদ্যেগে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের অর্থ  সহযোগিতায় নির্মিত ট্রাক টার্মিনাল আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। সেই থেকে ট্রাক প্রতি টার্মিনাল সেবা বাবদ ১০০ টাকা করে নেয়া হচ্ছে।

কথা হয় বেনাপোল পৌরসভার উচ্চমান সহকারী (বড় বাবু) আব্দুল্লাহ আল মামুন রনির সাথে। তিনি বলেন, “বেনাপোল” দেশের প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা। এ পৌরসভার নিজস্ব আয় থেকে সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন হয়। সেলক্ষ্যে ২০২০ সালের পৌর ট্রাক টোল ইজারা বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। তাতে মোহাম্মদ আলী সর্Ÿোচ্চ দরদাতা হওয়ায় তাকে ৪২ লাখ ১শ’ টাকায় টোল ইজারা দেয়া হয়। করোনাকালীন সময়ে
দীর্ঘ ১ বছর তিনি টোল আদায় করতে না পারায় ৩১ মার্চ/২১ তারিখে পৌরসভার মাসিক সভায় পূর্বের ইজারাদারের ইজারাটি বহাল রেখে ১৪২৮ বাংলা সনের ৩০ চৈত্র পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়।

বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আজিম উদ্দীন গাজী বলেন, বেনাপোল বন্দর কর্তৃপক্ষের যেখানে ট্রাক টার্মিনাল রয়েছে সেখানে পৌরসভার ট্রাক টার্মিনালের প্রয়োজন পড়েনা। বিতর্কিত ব্যক্তিরা পৌরসভার ট্রাক টার্মিনাল নিয়ন্ত্রণ করছে। এরা এখানে বনগাঁর কালিতলা ট্রাক টার্মিনালের মত চালকদের জিম্মি করে অর্থ হাতানোর ফাঁদ পেতেছে। ইতিমধ্যে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন মহল থেকে এমন চাঁদাবাজি ও সময় ক্ষেপনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। বলেছেন, এখানে সময় ক্ষেপনের কারণে
আমদানি-রফতানিকারকদের (ভারত-বাংলাদেশ) দু’পাশের বন্দরে ডেমারেজ বাবদ ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার অতিরিক্ত মাশুল গুণতে হচ্ছে।

বেনাপোল বন্দরের উপপরিচালক (ট্রাফিক) মামুন কবীর তরফদার বলেন, বেনাপোল পৌর ট্রাক টোল আদায় বন্দরের আওতার বাইরে হওয়ায় আমরা সেখানে হস্তক্ষেপ করতে পারিনা। তবে, ভারতে প্রবেশের আগে যদি পণ্যবাহী ট্রাক চালকদের বিভিন্ন টার্মিনালে প্রবেশ করতে হয় তাতে বাণিজ্যে ধীরগতি নেমে আসবে। এতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

কথা হয় বেনাপোল পোর্ট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মামুন খানের সাথে। তিনি পৌর ট্রাক টার্মিনাল এলাকায় চাঁদাবাজির বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বিষয়টি শুনেছি এবং আইনানুগ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যদি কেউ রাস্তায় দাড়িয়ে চাঁদাবাজি করে তাহলে পুলিশ বসে থাকবে না। তা শক্তভাবে প্রতিহত করা
হবে।

এ বিষয়ে কথা হয় যশোর জেলা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার আলী আহমেদ হাসমীর সাথে। তিনি বলেন, কোনো অবস্থাতেই ট্রাক থেকে চাঁদাবাজি মেনে নেয়া হবেনা। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে দেখা হবে। প্রমাণ পেলে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


error: Content is protected !!