ঢাকা, শনিবার, ২২শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৮ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
ঢাকা, শনিবার, ২২শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৮ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

সুলতানপুর এখন বাল্যবিয়ে রোধে মডেল গ্রাম

কাক ডাকা ভোর হতে সবুজখেতে ছোটে কৃষাণ-কৃষাণীরা। সকালে বইখাতা নিয়ে বের হয় শিশুরা। মসজিদ আর মক্তব থেকে ভেসে আসে কোরআনের সুর। আর স্কুলে স্কুলে শিশুদের কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার শপথ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের মেঠোপথ নানান বয়সী শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে।

সবুজ-শ্যামল ধানখেত, ছায়াঘেরা সড়কের ধারে ধারে পুকুর আর কাঁচা-পাকা সড়কে ছবির মতো অপরূপ সুলতানপুর। সেখানে ছেলে-মেয়ে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সম্ভাবনাময় সোনালী স্বপ্ন বোনা হয় প্রতিনিয়ত। সাড়ে ৩’শ বর্গমিটার আয়তনের এ গ্রামটি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার দূর্গাপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। সম্প্রতি এ সুলতানপুর গ্রামকে বাল্যবিয়ে মুক্ত গ্রাম হিসেবে ঘোষণা করেছে উপজেলা প্রশাসন।

গত ৬ মাসে সুলতানপুর গ্রামে কোনো বাল্যবিয়ে হয়নি। যা জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সরকারি কর্মকর্তাদের নজরে আসে। একারণে প্রশংসায় ভাসছেন গ্রামের অভিভাবকমহল। খুশি স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও। এর ফলে রংপুর জেলায় সুলতানপুর এখন বাল্যবিয়ে মুক্ত মডেল গ্রামে পরিণত হয়েছে। এই সাফল্য অর্জনের নেপথ্যে কাজ করছে ইউনিয়ন পরিষদ, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও গ্রামবাসী। সকলের সম্বলিত উদ্যোগে সুলতানপুর এখন বাল্যবিয়ে মুক্ত গ্রামের এক অনন্য উদাহরণ।

দূর্গাপুর ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা যায়, সুলতানপুর গ্রামের ৯০ ভাগ পরিবার কৃষি নির্ভরশীল। বিগত সময়ে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, ফসলের ভালো জাত না থাকা এবং উৎপাদনের আধুনিক কলাকৌশল থেকে পিছিয়ে ছিল এ গ্রামের মানুষেরা। ফলে লোকসান আর অভাব-অনটনের যাতাকলে কৃষি নির্ভর পরিবারগুলো ছেলে-মেয়েদের বাল্যবিয়ে দিতো। এতে করে পারিবারিক কলহ বৃদ্ধি, অল্প বয়সে গর্ভধারণ, বাচ্চা প্রসবে মায়ের মৃত্যু, অপুষ্ট শিশুর জন্মদানসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল গ্রামের পরিবারগুলো।

 

সারাদেশের মতো গত পনেরো বছরে বদলে গেছে এখানকার জনজীবন। কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, অবকাঠামো উন্নয়নসহ জীবনমানের উন্নয়নের সঙ্গে বেড়েছে জনসচেতনতাও। বর্তমানে এ গ্রামের ১৬১টি পরিবারের মধ্যে ১৭টি ধনী, ৩০টি মধ্যবিত্ত, ১১টি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত, ৩৭টি দরিদ্র ও ৬৬টি হতরিদ্র পরিবার রয়েছে।

এ বছরের মার্চ থেকে ওয়ার্ল্ড ভিশন নামে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা দূর্গাপুর ইউনিয়ন পরিষদকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামে শিশু ফোরাম গঠন করে। এসব পরিবারে ঝুঁকিপূর্ণ গ্রুপ হিসেবে ১২ থেকে ১৮ বছরের শিশু-কিশোরদের মধ্যে ৯ জন ছেলে ও ২৩ জন মেয়েকে চিহ্নিত করা হয়। শিশু ফোরামের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের বাল্যবিয়ের নেতিবাচক দিক সম্পর্কে সচেতন করা হয়। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও বাল্যবিয়ের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করা, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে জনগণকে হটলাইন নম্বর সম্পর্কে জানানো, সচেতনতামূলক বিভিন্ন উপকরণ বিতরণ করা হয়। এছাড়া গ্রামের সকল শ্রেণি পেশার মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয় করা, মাসিক সভার আয়োজন, বাড়ি বাড়ি পরিদর্শন ও মাসিক প্রতিবেদনের অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে বাল্যবিয়ে মুক্ত গ্রাম ঘোষণার উদ্যোগ গ্রহণ নেওয়া হয়।

শিশু ফোরামের এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে বিগত ৬ মাসের কোনো বাল্যবিয়ে হয়নি সুলতানপুর গ্রামে। আর এতেই ঘটা করে আনন্দ উৎসব করে গ্রামবাসী। বরাবরের মতো গ্রামের মানুষদের এই উৎসবকে আরো রঙিন করে তোলে ওয়ার্ল্ড ভিশন। শিশু-কিশোরদের নাচ, গান, বাল্যবিয়ে নিয়ে সচেতনতামূলক নাটক ও আলোচনায় মুখর হয়ে উঠেছিল এ উৎসব।

আনন্দময় সেদিনের সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে দিতে গ্রামের হাটে বাজারে, চায়ের দোকানে, মসজিদ-মাদরাসায়, স্কুলে স্কুলে এখনো বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে কাজ করছে সবাই। নিরা বেগম নামে এক অভিভাবক বলেন, আমি অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় আমার বিয়ে হয়। এরপর অল্প বয়সে গর্ভধারণ করি এবং আমার অপুষ্ট অসুস্থ বাচ্চার জন্ম হয়। আমি পুষ্টিকর খাবার না পেয়ে প্রসব পরবর্তী ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ি। এ নিয়ে আমার সংসারে নানা সমস্যা দেখা দেয়। আমি বাল্যবিয়ের কুফল জেনে এবং নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নিজের সন্তান ও প্রতিবেশীর কারো সন্তানকে বাল্যবিয়ে দিতে দেইনি। সবাইকে সচেতনতা করার জন্য চেষ্টা করছি।

কৃষি নির্ভর গ্রাম সুলতানপুর
বাল্যবিয়ে মুক্ত গ্রাম গড়ার লক্ষ্যে গঠন করা শিশু ফোরামের সংগঠক তাসফিয়া আক্তার হৃদিতা বলেন, আমরা শিশু ফোরামের সদস্যরা স্বেচ্ছায় এলাকায় জরিপ করে দেখেছিলাম ৩৫ জন শিশু বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে ছিল। আমরা শিশু-কিশোর ও তাদের অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে বাল্যবিয়ের কুফল বুঝিয়েছি। তাদের ছেলে অথবা মেয়ে যে একদিন প্রতিষ্ঠিত হয়ে পরিবারের অভাব-অনটন দূর করতে পারবে তা বুঝিয়েছি। এসব শুনে অভিভাবকরা সচেতন হয়েছেন।

সুলতানপুর গ্রাম উন্নয়ন কমিটির সভাপতি নাজমুল হুদা বাবলু তালুকদার বলেন, আমাদের অনেক দিনের চেষ্টা সার্থক হয়েছে। সুলতানপুর বাল্যবিয়ে মুক্ত গ্রাম হিসেবে ঘোষণা হওয়ায় আমরা এলাকাবাসী ভীষণ আনন্দিত। ওয়ার্ল্ড ভিশনের সহযোগিতায় আমাদের গ্রামের শিশুরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে গণস্বাক্ষর অভিযান পরিচালনা করেছে। এখন আমাদের গ্রাম বাল্যবিয়ে মুক্ত গ্রাম। এটা পুরো গ্রামের মানুষের জন্য আনন্দের ও গর্বের। আমরা মনে করি প্রতিটি গ্রামের মানুষ যদি সম্বলিত ভাবে চেষ্টা করে তাহলে ভবিষ্যতে আশপাশের এলাকাও বাল্যবিয়ে মুক্ত হবে।

দূর্গাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বলেন, বাল্যবিয়ে রোধে এলাকার শিশুদের সার্বিক সহযোগিতায় আমরা নানা কর্মসূচি পালন করেছি। সুলতানপুরের মতো পুরো ইউনিয়নকে বাল্যবিয়ে মুক্ত মডেল ইউনিয়ন করার জন্য আমি চেষ্টা করব। আশা করছি একেক করে প্রত্যেকটি গ্রামে এমন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে আমরা লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব।

মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রকিবুল হাসান বলেন, বাল্যবিয়ে হলে ওই প্রজন্মের পরের প্রজন্মকেও এর কুফল ভোগ করতে হয়। সুলতানপুর গ্রাম এখন রংপুর জেলার মডেল গ্রাম। এ মডেলকে ছড়িয়ে দিতে উপজেলা প্রশাসন কাজ করে যাবে। বাল্যবিয়েকে প্রতিরোধ করে এলাকার শিশু-কিশোররা উচ্চ শিক্ষিত হয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত স্মার্ট বাংলাদেশ বির্নিমাণে কাজ করবে এই প্রত্যাশা রাখছি।


error: Content is protected !!