ঢাকা, সোমবার, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
ঢাকা, সোমবার, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

বহুগুনের অধিকারী দীঘিনালার মদিনা ডেন্টাল কেয়ারের মালিক

মদিনা ডেন্টাল কেয়ারের মালিক মোহাম্মদ সেলিম

দীঘিনালা ( খাগড়াছড়ি ) প্রতিনিধি :
খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় পাহাড়ি অঞ্চলে মদিনা ডেন্টাল কেয়ারের মালিক মোহাম্মদ সেলিম। তিনি চিকিৎসক, ডেন্টিস্ট্রি আবার কখনো দন্ত চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ, সাংবাদিক, রাজনীতি বিদ ও কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবসায়ী । ভিজিটিং কার্ড, প্রেসক্রিপশন, ব্যানারে তার এসব পরিচয় মেলে।

সরজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পার্বত্য অঞ্চলের দীঘিনালায় মদিনা ডেন্টাল কেয়ারের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দাঁতের চিকিৎসার নামে প্রতারণা করে আসছেন মোহাম্মদ সেলিম নামের এই চিকিৎসক। নিজেকে দন্ত চিকিৎসক দাবি করলেও নেই কোন বিডিএস ডিগ্রি। চুক্তিভিত্তিক টাকা নিয়ে স্থানীয়দের অপচিকিৎসা দিয়ে আসছেন দিনের পর দিন। অভিযোগের অন্ত নেই এই ভুয়া চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। বোয়ালখালী নতুন বাজারে একটি চেম্বার ও খাগড়াছড়ি জেলা সদরের নারিকেল বাগান এলাকায় আরেকটি চেম্বারে তিনি নিয়মিত চিকিৎসা দিচ্ছেন। তাঁর কাছে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থতার চেয়ে জটিলতায় পড়েছেন অধিকাংশ দাতের রুগী।

দাঁতের চিকিৎসক সেলিমের ভিজিটিং কার্ড

ভুক্তভোগী ইমরান (২৩) বলেন, মোহাম্মদ সেলিম একাই এক্স-রের কাজ করেন, চিকিৎসা সেবা দেন। তাঁর চেম্বারে নেই কোন রেডিওগ্রাফির লোক, নেই কোন টেকনিশিয়ান।
আরেক ভূক্তভোগী সাইফুল জানান চুক্তি ভিত্তিক গ্যারান্টি দিয়ে তিনি দাঁত বসানোর কথা বলে ৩০ হাজার টাকা নেন। বছর না যেতেই সেই দাত নষ্ট হয়ে দাতের মাড়ি ফেটে যায়। উনার কাছে গেলে রাজনৈতিক প্রভাবে পান্টা হুমকি দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে দীঘিনালা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. তনয় তালুকদার বলেন, যদি কোন ডিগ্রি না থাকে তাহলে নামের আগে ডাক্তার বসানো আইন বহির্ভূত।

 

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ শহিদ হোসেন চৌধুরী সেলিমের পরিচালনাধীন আল মদিনা ডেন্টাল কেয়ারে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। দন্ত চিকিৎসক সনদ দেখাতে না পারায় তাঁকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। পাশাপাশি ডিগ্রি অর্জন করা ব্যতীত চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে কোন রকম চিকিৎসা প্রদান করবে না এই মর্মে একটি মুচলেকাও দেন।

হামলা ও রাজনৈতিক প্রভাবের ভয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রণি (ছদ্ম নাম) বলেন, নিজের ভুয়া চিকিৎসা কার্যক্রমের চালিয়ে নেওয়ার জন্য নিজেকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করেছেন মোহাম্মদ সেলিম। ২০১০ সালে উপজেলার বোয়ালখালী ইউপি’ ৮ নম্বর ওয়ার্ড যুব দলের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা যুবদলের সদস্য সেলিম বর্তমানে উপজেলা বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের সভাপতি। ২০১৪ সালে আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসার পর কৌশলে আওয়ামী লীগের দলীয় ব্যানারে যোগদান করেন সেলিম।

দাঁতের চিকিৎসক সেলিমের সাংবাদিক কার্ড

দীঘিনালা উপজেলা বিএনপি যুগ্ম সম্পাদক কাজী রানা সেলিমের ২০১০ সালে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় থাকার তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এব্যাপারে উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মো. কাশেম বলেন, দেশে এখন হাইব্রিড নেতাদের জন্য প্রকৃত আওয়ামী লীগ নেতারা বিপাকে রয়েছেন। ভুঁইফোড় সংগঠন ও কথিত ভুঁইফোড় নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।

একই ব্যক্তি মোহাম্মদ সেলিম সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যবসায়ী। গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা, পণ্য খোয়া, ঠিকমতো পণ্য ডেলিভারি না দেওয়া এবং অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ নেওয়া সহ নানা অনিয়মের অভিযোগ আছে তাঁর এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

 

সুন্দরবন কুরিয়ারের গ্রাহক সোহেল বড়ুয়া জানান, তাঁর একটি পার্সেল থেকে অন্তত ৩ হাজার টাকার পণ্য খোয়া যায়। এ বিষয়ে এজেন্টর মালিক সেলিমকে জানালে সে কোন পদক্ষেপই গ্রহণ করেনি।

সেলিমের ভগ্নিপতি শাহ-আলম জানান, ‘সেলিমের বাবা গ্রামে দন্ত সেবা দিত। বাবার কাছ থেকে তিনি দাঁতের চিকিৎসা কিছুটা রপ্ত করে। চট্টগ্রামের কোথাও থেকে কোর্স করে নিজেকে ডাক্তার বলে পরিচয় দিয়ে রাতারাতি এই এলাকায় একটি চেম্বার খুলে বসে। মূলত উপজেলা বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের সভাপতি হওয়ার পর থেকেই তাঁর উত্থান শুরু হয়।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত কাঠমিস্ত্রি সহকারী ছিলেন সেলিম। উপজেলার কাঠমিস্ত্রি মালেক এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সেলিম আমার ও মৃদুল কাঠমিস্ত্রির সঙ্গে কাজ করে দক্ষ কাঠমিস্ত্রি হয়ে ওঠেন একসময়।

নিজেকে সাংবাদিক হিসেবেও পরিচয় দেন মোহাম্মদ সেলিম। নিজের ফেসবুকে তিনি একটি সংবাদ মাধ্যমের আইডি কার্ডের ছবি পোস্ট করেন। সেখানে দেখা যায় তিনি টপ নিউজ ২৪ নামের অনলাইন নিউজ পোর্টালের খাগড়াছড়ি জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত মোহাম্মদ সেলিমের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বললে তিনি প্রথমে নিজেকে চিকিৎসক পরিচয় দেন। পরে বলেন তাঁর বিএমডিসির নিবন্ধন নেই। রাজনৈতিক ও সাংবাদিকতার পরিচয়ের সত্যতা নিশ্চিত করে তিনি এই প্রতিবেদককে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন।

খাগড়াছড়ির সিভিল সার্জন ডা. নুপুর কান্তি দাশ জানান, এমবিবিএস বা বিডিএস ডিগ্রিধারী না হলে কেউ নিজেকে ডাক্তার হিসেবে পরিচয় দিতে পারবেন না। কেউ এমন পরিচয় ব্যবহার করলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


error: Content is protected !!